বেসিক বিজনেস

Masud Sarker Rana

মাইন্ড-সেট।
বিজনেস করার জন্য প্রথমে যে বিষয়টা করতে হবে সেটা হল মাইন্ড-সেট করা। মানে আপনি যে ব্যবসা করবেন সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ব্যবসায় লাভ ক্ষতি হতে পারে এটা ভেবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া। যদি শুধু লাভ হবে, লস হবে না এইটা ভেবে ব্যবসায় নামেন তাইলে আপনি চরমভাবে ধরা খেতে পারেন।

অনেকেই আছে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভোগে। চাকরি ছেড়ে দিলে ব্যবসায় সফল হব তো, চাকরি ব্যবসা দুইটাই একসাথে করতে চান অনেকে। এটা অনেকটা দুই নৌকায় পা দেওয়ার মতই। যে কোন একটার পক্ষে দৃঢ়ভাবে থাকতে হবে। তবে যারা একবারে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করতে চান তাদের জন্য আমার পরামর্শ হল ইনভেস্টসহ অন্তত ২/৩ মাস ফ্যামিলি চালানোর মত ব্যাক আপ নিয়ে নামুন। কারণ ব্যবসা থেকে বেনিফিট আসতে দেরিও হতে পারে।

ব্যবসায়ের ধরণ ঠিক করা।

আপনাকে ঠিক করতে হবে কি ধরণের ব্যবসা করবেন। প্রোডাকশন হাউজ, ডিস্ট্রিবিউটর/এজেন্ট, পাইকার, লজিস্টিক সাপোর্ট, কোন সার্ভিস, এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট, নাকি কনজ্যুমার প্রোডাক্ট। এইটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি ব্যবসায়ের ধরণ ঠিক না করতে পারলে আইডিয়া পাবেন না। আপনার সামর্থ কোন জিনিষ ভাল বুঝেন, বিজনেস প্লেস, মার্কেটিং চ্যানেল এসবের উপর নির্ভর করে কোন ধরণের ব্যবসা সিলেক্ট করতে হবে ।

প্রথম দিকে শুধু একটা ক্যাটাগরি, একটা বিজনেস নিয়েই প্ল্যান সাজাবেন। কারণ যে এক সাথে ৩/৪ টা গাধার পিছনে দৌড়ায় সে কোনটারেই ধরতে পারে না। আমাদের বেশিরভাগেরই একটা কমন প্রবলেম পুঁজি অনুযায়ী আইডিয়া সেট করা। কিন্তু বিজনেস রুল বলে আইডিয়া অনুযায়ী পুঁজি সিলেক্ট করতে হবে। আপনার সামর্থ্যের মধ্যে কয়েকটা আইডিয়া নিয়া একটা রেঞ্জ করুন।

ব্যবসায়ের প্রাথমিক আইন-কানুন জানা।
একটা ব্যবসা শুরু করার জন্য অবশ্যই আপনাকে অন্তত ব্যবসায়ের প্রাথমিক কিছু আইন-কানুন জানতে হবে। যেমন ট্রেড লাইসেন্স কিভাবে করতে হয়, কোথায় থেকে করতে হয়, টিন রেজিস্ট্রেশন, টিন রিটার্ন পদ্ধতি, ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে আয় করের পরিমাণ, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন, ভ্যাট প্রদান পদ্ধতি, জয়েন্ট স্টক রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড মার্ক রেজিস্ট্রেশন ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। অন্যথায় আপনি কখন কিভাবে আইনের গ্যাঁড়াকলে পরে যাবেন তা নিজেও জানতে পারবেন না। এ বিষয়গুলো সম্পর্কে আমাদের গ্রুপের ডক ঘাঁটলে হালকা পাতলা ধারণা পাবেন। তবে বিস্তারিত জানতে হলে আপনাকে কোন আইনজীবীর সাথে কথা বলতে হবে। আর অবশ্যই প্রয়োজনীয় সব কিছু বৈধভাবে করবেন। কোন ব্যবসার জন্য কি কি ডকুমেন্ট করতে হবে সেটাও জানতে হবে।

আইডিয়া চয়েজ/কিভাবে আইডিয়া বের করবেন।
শিব খেরা বলেছেন An Idea can change your life. ব্যবসায়ের ক্ষেত্রেও এই কথাটা পুরোপুরি প্রযোজ্য। স্থান, কাল, চাহিদা এসবের ভিত্তি করে আপনি যত ভাল আইডিয়া সেট করতে পারেন আপনার ব্যবসায় সফল হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। ব্যবসায়ের সফলতা নির্ভর করে সঠিক আইডিয়া চয়েজের উপর। আপনি হয়ত অন্যদের থেকে প্রাথমিক আইডিয়া নিতে পারবেন। কিন্তু আইডিয়া এক্সকিউট করা, প্ল্যান সাজানো, এনালাইসিস এসব আপনাকেই করতে হবে। অনলাইন থেকে কেউ একজন বসে করে দিলেও সেটা আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

আইডিয়া চয়েজের ক্ষেত্রে লোকেশন, মানুষের জীবন যাত্রার মান, লোক সংখ্যা, শিক্ষার হার, কোন কিছুর উপর মানুষের দুর্বলতা এসবের উপর ভিত্তি করে আইডিয়া পছন্দ করতে হয়। আপনার এলাকায় কোন সার্ভিসের অভাব আছে? তাহলে শুরু করতে পারেন সার্ভিসিং যেমন মোবাইল সার্ভিসিং, কম্পিউটার সার্ভিসিং, কমিউনিটি সেন্টার, ডেকোরেটর, ফটোগ্রাফি, ইভেন্ট ম্যানেজম্যান্ট, ইলেকট্রনিক্স ম্যাকানিক, লন্ড্রি, বিউটি পার্লার, কোচিং সেন্টার/স্কুল কলেজ, ভিসা/ট্রাভেল এজেন্সি ইত্যাদি অনেক ধরণের সার্ভিস।

অথবা আপনার এলাকার মানুষকে একটু নিভৃতে আড্ডা দিতে চায়, কোথায়ও বসে গল্প গুজব করতে চায়? তখন আপনার আইডিয়া হবে টি স্টল, কফি শপ, রেস্টুরেন্ট, মিনি চাইনিজ, ফুচকা-চটপটি, পার্ক, উদ্যান ইত্যাদি।

অথবা ধরেন এমন পণ্য যেটা ঢাকায় উৎপাদিত হয়ে আপনার এলাকায় আসে। আপনি নিজে ঐসব পণ্য উৎপাদন করে ঢাকার নামি দামি বড় কুতুবদের থেকে কম দামে বিক্রি করে মার্কেট ধরতে পারেন। এই যেমন দিয়াশলাই, চানাচুর, বিস্কুট, কেক, বস্ত্র, প্লাস্টিক ইত্যাদি উৎপাদনশীল ব্যবসা।

অথবা আপনার এলাকায় এমন কোন কনজুমার প্রোডাক্ট যেটার সাপ্লাইয়ার কম রয়েছে সেটা নিয়েও করতে পারেন। এই যেমন কসমেটিক্স, খাদ্য দ্রব্য, গিফট আইটেম (বর্তমানে ১-৯৯ শপ), খেলাধুলার সরঞ্জাম ইত্যাদি।

অথবা আপনি কি খেয়াল করেছেন আপনার এলাকার মানুষ বিদেশি পণ্য ব্যবহার করে থাকে। তখন আপনার টার্গেট হবে ইমপোর্ট করা। তবে ইমপোর্ট করলে আপনাকে রিটেইল কাস্টমারের চেয়ে বি২বি ব্যবসার দিকেই বেশি নজর দিতে হবে।

এইভাবে আপনি যদি ব্যবসায়ের ক্যাটাগরি করে সমস্যা বের করতে পারেন তাইলেই অনেক ভাল ভাল আইডিয়া পেয়ে যাবেন। তখন আর আমাকে ইনবক্সে বলতে হবে না মাসুদ ভাই আমার কাছে এত টাকা আছে। কিছু আইডিয়া দেন। এই যে দেখেন না আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেকগুলো আইডিয়া দিয়ে ফেললাম।

সম্ভাব্যতা যাচাই/মার্কেট রিসার্চ।
আইডিয়া পছন্দ করার পর আপনার কাজ হল সেটার সম্ভাব্যতা যাচাই করা। ব্যবসায়ের পরিভাষায় সেটাকে বলে মার্কেট রিসার্চ। মার্কেট রিসার্চ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি মার্কেট যাচাই না করেই ব্যবসা শুরু করে দেন তাইলে ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা ৮০%। মার্কেট রিসার্চের সময় আপনাকে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে তা হল
১। আপনার কাস্টমার কারা?
২। তারা কোথায় থাকে?
৩। তাদের থেকে আপনার দূরত্ব কত?
৪। তাদের মাঝে আপনার প্রোডাক্টের চাহিদা কেমন?
৫। আপনার আগেই কি কেউ এই প্রোডাক্টটা তাদের কাছে দিচ্ছে? দিলে তারা কতটুকু শক্তিশালী?
৬। যদি প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে তাহলে আপনি তাদের টেক্কা দিয়ে ব্যবসা করবেন নাকি তাদের রাখা ফাঁক ফোকর দিয়ে ব্যবসা করবেন?
৭। আপনার প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে আপনার পণ্যে আলাদা কোন বৈশিষ্ট্য আছে কিনা যার জন্য ক্রেতারা আপনার পণ্য নিবে?
৮। আপনি কি নির্ধারিত সময়ে ব্রেক ইভেন পয়েন্টে যেতে পারবেন?
৯। শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর মাঝেও ব্যবসা করার সুযোগ আছে কিনা?
১০। আপনার পণ্য মানুষের মাঝে উপস্থাপন করার মত উপযুক্ত লোক আছে কিনা?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যখন লিখবেন তখন মার্কেট যাচাই হয়ে যাবে। যদি ইতিবাচক হয় তাহলে ব্যবসা রান করানো যাবে। না হলে আইডিয়া চেঞ্জ করে নতুন আইডিয়া বের করতে হবে।

প্ল্যানিং করা।
ব্যবসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল প্ল্যানিং করা। প্ল্যানিং সঠিক না হলে ব্যবসায় ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা ১০০%। প্ল্যানিং বিষয়টা ব্যাপক। আমি এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করতেছি। বিস্তারিত জানতে ইন্টারের ম্যানেজম্যান্ট বই পড়তে পারেন। প্ল্যানিং হল ব্যবসায়ের দর্পণ। প্ল্যান দেখেই বিজনেস সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা চলে আসে। প্ল্যানিং করার জন্য আপনি যেই বিষয়গুলো দেখবেন তা হচ্ছে
*পুঁজি কত খাটাবেন?
*পুঁজি কোথায়, কিভাবে খাটাবেন?
* আপনার প্রোডাক্ট মার্কেটিং করবেন কই? প্রতিদ্বন্দ্বীকে টেক্কা দিবেন না তাদের ফাঁক ফোকরে বিজনেস করবেন?
* আপনার রেভিনিউ টার্গেট কত?
* আপনার কাঙ্ক্ষিত রেভিনিউ আসতে কত দিন লাগবে?
* ব্যবসা শুরুর প্রথম মাস থেকেই কি রেভেনিউ আসবে? নাকি কয়েক মাস প্রফিট ছাড়াই থাকতে হবে?
* প্রথম মাসে রেভিনিউ না আসলে কতদিন এইভাবে চলবে? প্রফিট না আসা পর্যন্ত বিজনেস টিকিয়ে রাখতে কতটাকা ইনভেস্ট করতে হবে?
* বিজনেস রানিং করতে কতজন এমপ্লয়ী লাগবে? তাদের বেতন কেমন হবে?
* বড় কোম্পানি হলে পরিচালনা কিভাবে হবে? ম্যানেজম্যান্ট কিভাবে হবে?
* আপনার প্রোডাক্ট/সার্ভিসের সেলস চ্যানেল কিভাবে তৈরি করবেন?
* আপনার প্রফিট মার্জিন কেমন হবে?
* প্রোডাকশন ব্যবসা হলে কাঁচামাল কোথায় থেকে আসবে? সেটা কি সহজলভ্য, সব সময় পাওয়া যাবে?
* ব্যবসা কি সারা বছরের জন্য না মৌসুমি?
* প্রফিট কি পুরোটাই পকেটে পুরবেন নাকি কিছু মূলধনে কনভার্ট করবেন?
* মোট পুঁজির পুরোটাই কি এককালীন বিনিয়োগ করতে হবে নাকি ধীরে ধীরে বিনিয়োগ করতে হবে?
* মার্কেট পেয়ে গেলে চাহিদা সামাল দিতে পারবেন কিনা?
* পুঁজির উৎস কি হবে?
*প্রথম প্ল্যানে সফল না হলে বিকল্প প্ল্যান কি?

এ রকম আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর যখন লিখা হয়ে যাবে তখন আপনার প্ল্যানিং করা হয়ে গেছে। সঠিকভাবে প্ল্যানিং করতে পারলে রিস্ক ফ্যাক্টর অনেক কমে যায়। ব্যাস এরপর আল্লাহ ভরসা করে বিজনেসে নেমে যান।

(Visited 471 times, 1 visits today)